প্রেমের নরম আলোর সুরেলা ঢেউ

এবারের বইমেলায় মারমেইড থেকে এসেছে কবি সোহেল মাহবুবের হৃদয় নিঙড়ানো ভালোবাসার পঙক্তির সংকলন প্রেমের কবিতা। কাব্যগ্রন্থটি গোণাগুণতির হিসাবে সোহেল মাহবুবের ষষ্ঠ সন্তান। সোহেল মাহবুব কবিতা চর্চা করছেন দুই দশকের অধিক সময় ধরে। এর মধ্যে করেছেন গদ্যেও লালন। গত ২০১৭ সালে বই মেলায় প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর গল্পগ্রন্থ ‘জেলখানার পরী’। তবে গদ্যের চেয়ে কবিতাই যে তাঁর কাছে প্রিয়, তার প্রমাণ হিসাবে বলা যায় তাঁর ছয়টি গ্রন্থের মধ্যে পাঁচটিই কাব্যগ্রন্থ। তিনি যে কবিতা সৃজন করতেই অধিক ভালোবাসেন, তাই এই সংখ্যা থেকেই বুঝা যায়।

সোহেল মাহবুব যে ধরনের কবিতা সৃজন করেন সেদিক থেকে ‘প্রেমের কবিতা’ একটি ব্যতিক্রমী প্রয়াস। আর কাব্যগ্রন্থের নামকরণও বেশ আকর্ষণীয়। কবি আহসান হাবীব ছাড়া আর কেউ কাব্যগ্রন্থের এমন নাম রেখেছেন কিনা আমার স্মরণ হয় না। তবে প্রেমের কবিতা বলতেই আমাদের মনে যে রকম ধারণা জন্মে সেখান থেকে নিজেকে খুব সুনিপুণভাবে নিজেকে রক্ষা করেছেন কবি। তিনি প্রেমের কবিতার নামে সস্তা কিছু অশ্লীল বর্ণনা দিয়ে কাব্যটি সাজাননি। তাঁর কাব্য শরীরে যেমন আছে প্রেমিকার প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ; পাশাপাশি তিনি প্রকৃতির সাথে মিল খুঁজেছেন প্রিয় রমণীর। তবে সেই রমণীর সাথে রমণীয় সম্পর্কেও চিত্র তুলতে গিয়ে তিনি খূবই সচেতনতার পরিচয় দিয়েছেন। ঠিক ডিমে যে পরিমাণ লবণ দিলে, ডিমের স্বাদ নষ্ট হয় না। কবিতাতেও সোহেল মাহবুব সেই পরিমাণ মতই নিয়ে এসেছেন প্রেমের গভীরতম সম্পর্কেও চিত্র। ‘রেশমী বর্ণমালা’ কবিতার কয়েকটি পঙক্তি এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য :

তোমারও শৈল্পিক চিবুক ছুঁয়ে জোছনা নামে জন্মের বাগানে
কী এক অচেনা ঘোর ঘিরে রাখে রাতের গোপন তীর
জলরঙ নেচে যায় তোমার অদেখা খাতার শরীরের
ক্যানভর্তি ঘুম হাতে দাঁড়িয়ে নেশার চুমু আঁকে ইতিহাস।
(রেশমী বর্ণমালা, পৃ. ১২)

এই লাইনগুলো পড়তে পড়তে পাঠক হারিয়ে যায় নিজের কল্পনার জগতে। যে জগত অনেক দূরের। যেখানে ইতিহাস আর বাস্তব এক জায়গায় ঠাঁই দাঁড়িয়ে। মাহবুব-এর কবিতা যে বৈশিষ্ট্য আর হৃদয় গ্রাহী তা হলে, তিনি অনেক কিছুই বলেন ইশারায়, আকারে-ইঙ্গিতে, উপমায়। তিনি যেন পণ করেছেন সবই বলবেন, কিন্তু কিছুই বলবেন না। এই বলা আর না বলার চক্করে পাঠক অবশ্য কবিতার ক্ষুরধারতা যে বুঝতে পারবেন তাতে কোন সন্দেহ নেই। কেননা মাহবুব তার কবিতাকে অযথায় জটিল করতে ভালোবাসেন না। তিনি কবিতাকে উপমার ছত্রছায়ায় গড়ে তুলতে চান। অপ্রাসঙ্গিক কোন শব্দের জটাজালে কবিতার রহস্যময়তা ক্ষয়িষ্ণু করতে চান না বরং সহজভাবে তৈরি করেন এক বিশেষ মায়াবাস্তবতা। যেমন :

ক. সকালের রোদ বিপন্ন হতে হতে হয়ে ঝরে রোপিত চারায়
সে চোখ থেকে যৌবন আছড়ে পড়ে বিমুগ্ধ দর্শকের শার্টের কলারে। (প্রলয় বসন্ত, পৃ. ১৪)

খ. হিমালয়ের মাথার খাঁজকাটা মুকুট
যেন একটাই পথ একটাই মত
দিঘির ধারে দিগম্বর জল বালক-
অপেক্ষায় থাকে জল বালিকার,
যে সমুদ্রের শাড়ি পরে হাঁটে লোমশ গালিচায়। (আরতি, পৃ. ১০)

তবে প্রেমের কবিতা শুধু যে নারী প্রেমের আকর এমন ধারণা করা হবে ভুল। এতে আছে প্রকৃতির মনোরম বর্ণনা। সেই প্রকৃতির মাঝে কবি দেখেন প্রিয় মানুষটির কলতান মুখরিত হাসির প্রতিচ্ছবি। এ প্রসঙ্গে স্মরণযোগ্য তার ‘চালাঘর’ কবিতা পঙক্তি সমুচয় :

ঝর্না পেটে ধরেছে তোমার হাসি
আমি অজস্র নয়নে চেয়ে থাকি ঠোঁটের সীমান্তে। (চালাঘর, পৃ. ১৭)

আবার ‘খোঁপা খুলতেই খোলা পিঠে ওঠে ঘনায়িত মেঘের টেউ/ যেন বর্ষার আকাশ থেকে একটুকরা জলের ওড়না। এই তো হলো মাহবুবের নিসর্গ নায়িকা যাকে তিনি রাত্রিচরের মত খোঁজেন ‘মরুময় এসব রাতে অন্ধ পাখির মতো’। তবে কখনো বা সেই নায়িকায় হয়ে ওঠে দেশ মাতৃকা : এই বুকের জমিনতো খাস নয়
যে যার মতো লাঙ্গল চালাবে!
এই জমিনের বুকে বিকেলের রোদ ঝরে
এই জমিনের পাঁজরে বৃষ্টি আছড়ে পড়ে
এই জমিনের নদী উজানে যায়… (ভালোলাগার জমিন, পৃ.২৪)
এর পরের পঙতিতেই এই দেশ মাতৃকা হয়ে ওঠে কবির নায়িকা। দুইর মধ্যে মিল করে বলে ওঠেন ‘এই জমিন আমার ভালোলাগার ভালোবাসার।’
কাব্য করিমের সুসজ্জিত প্রচ্ছদে ‘প্রেমের কবিতা’য় মলাট বদ্ধ হয়েছে ৫৫টি কবিতা। এই কবিতাগুলোর চিত্রকল্প ও উপমার যে ব্যবহার তা আমাদের ঘোর লাগিয়ে দেয়। কাব্যগ্রন্থটির মূল্য রাখা হয়েছে ১৫০ টাকা। একুশে বইমেলা ২০১৯ এ পরিবেশন করছেন পরিলেখ প্রকাশনী। কাব্যগ্রন্থটির বহুল পাঠকপ্রিয়তা কামনা করছি।

লেখক : শাহাদাৎ সরকার, রাজশাহী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

two + 5 =

SinglePostBottom